কয়েক সেকেন্ডেই শেষ হয়ে যায় জীবনের সব গল্প: মৃত্যুর বাস্তবতা মানুষকে কী বার্তা দেয়?
আইয়ুব আলী। রংপুর
মানুষ পৃথিবীতে আসে সীমিত সময়ের জন্য। জন্মের পর থেকে মানুষ দুনিয়ার ব্যস্ততা, স্বপ্ন, সফলতা আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন পার করতে থাকে। কেউ অর্থের পেছনে ছুটে, কেউ ক্ষমতার পেছনে, আবার কেউ নিজের পরিবার ও ভবিষ্যৎ গড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু জীবনের এক নির্মম সত্য হলো—একদিন সবকিছু থেমে যায়।
একজন মানুষ কয়েক সেকেন্ড আগেও হয়তো পরিবারের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় ব্যস্ত ছিলেন, নিজের কাজ নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তখন আর তার পরিচয় থাকে না ধনী, গরিব, নেতা বা সাধারণ মানুষ হিসেবে। মৃত্যুর পর সবাই একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়—অমুক ব্যক্তি আর পৃথিবীতে নেই। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। কেউ বাঁশ কাটার ব্যবস্থা করেন, কেউ সাদা কাফনের কাপড় কিনে আনেন, আবার কেউ গোলাপজল, আতর ও জানাজার প্রস্তুতি নেন।
যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও জীবিত ছিলেন, তিনি তখন নিথর দেহ হয়ে শুয়ে থাকেন। পরিবারের কান্না, স্বজনদের আহাজারি আর চারপাশের নীরবতা যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—মানুষ আসলে কতটা অসহায়।
ইসলামে মৃত্যুকে জীবনের শেষ নয়, বরং আখিরাতের জীবনের শুরু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষের জন্য নির্ধারিত সময় ঠিক করে রেখেছেন। সেই সময় শেষ হয়ে গেলে পৃথিবীর কোনো শক্তিই মানুষকে আর এক মুহূর্ত সময় দিতে পারে না।
ধর্মীয় আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, মানুষের জীবনের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার সম্পদে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই রয়েছে। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে যায় না তার অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি কিংবা ক্ষমতা। সঙ্গে যায় শুধু তার আমল বা কর্ম।
জানাজার পর কয়েকজন মানুষ কাঁধে তুলে নিয়ে যান মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থানে। মাটির একটি ছোট গর্তে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাকে। এখানেই শেষ হয়ে যায় পৃথিবীর সমস্ত পরিচয়, ব্যস্ততা আর অহংকার।
অনেকেই মৃত্যুর এই বাস্তবতা দেখেও শিক্ষা নিতে পারেন না। দুনিয়ার মোহ, হিংসা, অহংকার আর পাপের পথে মানুষ বারবার জড়িয়ে পড়ে। অথচ কবরের নীরবতা মানুষকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—এই জীবন ক্ষণস্থায়ী।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে মানুষের অন্তর নরম হয় এবং সে গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। কারণ মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে একদিন তাকেও সাদা কাফনে জড়িয়ে অন্ধকার কবরে শুয়ে থাকতে হবে, তখন তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
বর্তমান সময়ে মানুষ প্রযুক্তি ও আধুনিকতার পেছনে যতই এগিয়ে যাক না কেন, মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। প্রতিদিন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন। কারও মৃত্যু দুর্ঘটনায়, কারও অসুস্থতায়, আবার কেউ হঠাৎ করেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুর বাস্তবতা নিয়ে ভাবা মানসিকভাবে মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে। এতে মানুষ অন্যায়, অবিচার ও পাপ থেকে দূরে থাকার অনুপ্রেরণা পায়। পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও মানবতার প্রতি দায়িত্ববোধও বৃদ্ধি পায়।
ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মনে করেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজে লাগানোই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। নিয়মিত নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, মানুষের উপকার করা এবং সৎ পথে চলার মাধ্যমেই একজন মানুষ আখিরাতের সফলতা অর্জন করতে পারেন।
আজ যারা জীবিত, আগামীকাল তাদের অনেকেই হয়তো এই পৃথিবীতে থাকবেন না। তাই মৃত্যুর বাস্তবতা মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবন খুবই অল্প সময়ের। আর এই অল্প সময়ের মধ্যেই একজন মানুষকে ঠিক করতে হয়, সে আল্লাহর পথে চলবে নাকি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে হারিয়ে যাবে।
মৃত্যুর এই চূড়ান্ত সত্য মানুষকে শুধু ভয় দেখায় না, বরং সঠিক পথে ফিরে আসারও আহ্বান জানায়। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে ফিরে যেতেই হবে তার সৃষ্টিকর্তার কাছেই।