গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে আর কেউ স্বৈরাচার হতে পারবে না: অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি
আইয়ুব আলী। রংপুর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে আর কেউ স্বৈরাচার হয়ে উঠতে পারবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, যাদের নতুন করে স্বৈরাচার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তারা গণভোটের রায় মেনে নিতে পারছে না। দেশের ছাত্র-জনতা নতুন বাংলাদেশে আর কোনো স্বৈরাচারকে জায়গা দেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার (১৫ মে) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের থানা ও বিভাগীয় দায়িত্বশীল শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে দিনব্যাপী এই শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়। এতে মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও দায়িত্বশীলরা অংশ নেন।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো সরকার কখনো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। তিনি সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার রাজনৈতিক পরিণতি শুভ হয় না। তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জনগণ রাজপথে নামলে তা কারও জন্যই সুখকর হবে না।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখন রাজনৈতিক সচেতন। ছাত্র-জনতা নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে কোনো অপচেষ্টা সফল হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, নতুন বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের মুখেও জামায়াতে ইসলামী জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, দলের ওপর “টর্নেডোর মতো” দমননীতি চালানো হলেও সংগঠনটি ধ্বংস হয়নি বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর বহু শীর্ষ নেতা জীবন দিয়েছেন। অসংখ্য নেতাকর্মী খুন, গুম, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু যারা জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করতে চেয়েছিল, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তারাই রাজনৈতিকভাবে বিলীন হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জনগণ জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” ও ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে জনগণের রায় পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই ধরনের কারচুপির আশঙ্কা সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। এজন্য তিনি দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের জনশক্তিকে সতর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
শিক্ষাশিবিরে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি।
সভাপতির বক্তব্যে নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, জাতীয় নির্বাচনে জনগণ জামায়াতে ইসলামীকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু ভোট কারচুপির মাধ্যমে সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা হতে পারে।
তিনি সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রশাসন, গণমাধ্যম, পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শিক ও মানবিক সংগঠন। তাই দলীয় নেতাকর্মীদেরও মানবিক আচরণ ও আদর্শিক চরিত্রের পরিচয় দিতে হবে।
নূরুল ইসলাম বুলবুল আরও বলেন, দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে। সামাজিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, দেশ ও জাতির খেদমতের মধ্য দিয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। এজন্য সংগঠনের সব স্তরের নেতাকর্মীদের জনকল্যাণমূলক কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মাওলানা আবদুস সালাম। তারা সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শিক্ষাশিবিরে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির, এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, ড. আব্দুল মান্নান এবং মুহাম্মদ শামছুর রহমান।
এছাড়াও মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্যদের মধ্যে সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, অধ্যাপক মোকাররম হোসাইন খান, এডভোকেট এস.এম কামাল উদ্দিন, মাওলানা ফরিদুল ইসলাম, ডা. আতিয়ার রহমান, অধ্যাপক নুর নবী মানিক, মাওলানা মোশাররফ হোসেন, ড. মোবারক হোসেন, আবদুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল হক, কামরুল আহসান হাসান, শাহীন আহমেদ খান ও মাওলানা শরিফুল ইসলামসহ মহানগরীর মজলিসে শুরার সদস্য এবং থানা ও বিভাগীয় দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শিক্ষাশিবিরে নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে গণভোট, জুলাই সনদ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কার ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি সংগঠনকে জনমুখী ও সামাজিক কার্যক্রমমুখী করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।