প্রাক-বাজেট সংলাপ: ইসলামবান্ধব বাজেট ও যাকাতভিত্তিক অর্থনীতির আহ্বান
আইয়ুব আলী। রংপুর
২৪ মে: জাতীয় প্রেসক্লাবে সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘প্রাক-বাজেট সংলাপ: উলামায়ে কেরামের ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভা। রবিবার অনুষ্ঠিত এ সংলাপে দেশের শীর্ষ আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অংশ নিয়ে আগামী জাতীয় বাজেটকে জনবান্ধব ও ইসলামবান্ধব করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা সুদনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে উৎপাদনমুখী ও যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের সভাপতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী আল কাসেমী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য নির্ধারিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সরকার ঘোষিত মডেল মসজিদ প্রকল্পের গেজেট দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, দেশের ওয়াকফ এস্টেটগুলোকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।
তিনি পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজে বৈষম্য ও অস্থিরতা তৈরি করছে। তাই ইসলামী শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। তিনি সরকারের প্রতি এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
সংলাপে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন মুহাদ্দিস মাওলানা রবিউল বাশার এমপি, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, বর্ষীয়ান আলেমে দ্বীন অধ্যক্ষ মাওলানা জয়নুল আবেদীন, কেন্দ্রীয় ওলামা কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল হালিম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কাসেম কাসেমী, মাওলানা মহিউদ্দীন রব্বানী, সরসিনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা শাহ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দীকি, অধ্যক্ষ ড. মাওলানা মহিউদ্দিন আহমেদ, মুসলিম জনতা ঐক্য পরিষদের আমির মাওলানা আজিজুর রহমান, হাফেজ মাওলানা হাবীবুল্লাহ মোহাম্মদ ইকবাল, মাওলানা আ ন ম হেলাল উদ্দিন, মুফতি ফখরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, ড. মীম আতিক উল্লাহ, অধ্যক্ষ মাওলানা শহীদুল্লাহ, মুফতি মহিউদ্দিন, মুহাদ্দিস ড. মাহমুদুল হাসান ও মাওলানা রফিকুল ইসলাম মিয়াজী প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণের ওপর করের চাপ বৃদ্ধি না করে উৎপাদনমুখী খাতকে উৎসাহিত করতে হবে। তারা কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিমুখী খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন বক্তারা।
আলোচনায় অংশ নেওয়া আলেমরা বলেন, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তে যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা জরুরি। তাদের মতে, যাকাত ব্যবস্থা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য বিমোচন, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক বৈষম্য হ্রাস করা সম্ভব হবে।
প্রধান আলোচক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি কল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়ন করতে হলে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, বাজেটের অর্থ যেন প্রকৃত উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়, সে বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবি জানান তিনি।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, দেশের আলেম সমাজ দীর্ঘদিন ধরে ইসলামসম্মত অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটে ইসলামিক ব্যাংকিং, ওয়াকফ সম্পদ উন্নয়ন, মসজিদভিত্তিক জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং যাকাত ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সংলাপ শেষে উপস্থিত বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটবে। একই সঙ্গে তারা এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যা হবে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী।