আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল
আইয়ুব আলী | রংপুর
সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয়জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত নবজাতকদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো হাসপাতালে দুর্ঘটনা, অবহেলা বা চিকিৎসাগত ত্রুটির অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে যদি কোনো ব্যক্তি, চিকিৎসক, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবহেলা, দায়িত্বহীনতা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই একটি বৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স বাতিলের মাধ্যমে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে আদ-দ্বীন হাসপাতাল সাধারণ মানুষের কাছে ‘গরিবের হাসপাতাল’ হিসেবে পরিচিত। স্বল্প খরচে চিকিৎসা প্রদান এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার কারণে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অসংখ্য মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীদের জন্য হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলাকালে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নজরদারি, তদারকি কিংবা সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু সরাসরি লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী সাধারণ জনগণের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, হাসপাতালটির সেবা গ্রহণকারী হাজারো রোগী এখন চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
এদিকে আদ-দ্বীন হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্রই নয়, এটি একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবেও পরিচালিত হয়ে আসছে। এখানে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করছে বলে জানা যায়। একইসঙ্গে নার্সিং শিক্ষা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। লাইসেন্স বাতিল ও হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে এসব শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে তাদের অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, একাডেমিক ক্ষতি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার মতো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একইভাবে নার্সিং শিক্ষার্থীরাও তাদের কোর্স সম্পন্ন করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
স্বাস্থ্যখাত বিশ্লেষকদের মতে, একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে সেই প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত যাতে রোগীসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা এবং জনস্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সচেতন মহলের দাবি, নবজাতক মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একইসঙ্গে হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তারা মনে করেন, জনস্বার্থ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার যেমন জরুরি, তেমনি সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, সরকার বিষয়টি মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করবে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে।