আওয়ামী লীগের সব গুম-খুন গণহত্যার বিচারের দাবিতে রাজধানীতে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশ
আইয়ুব আলী
রাজধানীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত সব গুম, খুন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকি মোড়ে আয়োজিত এ সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। তারা আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেন, আওয়ামী লীগ একসময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত নিজেরাই রাজনৈতিকভাবে নির্মূল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী কারও রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা আপসহীন ভূমিকা পালন করে যাব।”
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, নির্বাচন-পূর্ব সময়ে বিচার ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, বিচার ও সংস্কারকে উপেক্ষা করে সরকার যদি ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটে, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে যা যা প্রয়োজন, তাই করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারও প্রতি প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সরকারের বিদায় নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারও সম্পন্ন হয়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্বের জন্য চিফ প্রসিকিউটরের সমালোচনা করে তার পদত্যাগ দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত না হলে বর্তমান সরকার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারবে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তিনি বলেন, “নতুন বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদের স্থান হবে না। জীবন দিয়ে হলেও আমরা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করব।” তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের বিচার করতে ব্যর্থ হলে বিএনপিকেও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য বিএনপি ভুলে গেছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “বিচার করতে যদি ভয় লাগে, তাহলে ক্ষমতায় এলেন কেন?” একই সঙ্গে তিনি জুলাই জাদুঘর দ্রুত উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আওয়ামী লীগকে আর বাংলাদেশের মাটিতে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি আওয়ামী শাসনামলে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) নেতা ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, দলটি দেশের জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে বিদেশি প্রভাবের প্রতিনিধিত্ব করেছে। অন্যদিকে এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাহ হোসেন মিয়াজী আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান।
সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনেই শত শত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা সরকারের ব্যর্থতার প্রমাণ। বিচার আদায়ের জন্য রাজপথেই আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আহমেদ আলী কাসেমী, আব্দুল মাজেদ আত-তাহেরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তারা সবাই আওয়ামী লীগের আমলে সংঘটিত গুম, খুন ও গণহত্যার বিচার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নেতারা বলেন, দেশে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।