আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে গুমের শিকারদের সন্ধান ও বিচারের দাবি
আইয়ুব আলী
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুমের শিকার সব ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে গুমের প্রতিটি ঘটনার সত্য উদঘাটন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশে গুমকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের একটি ভয়াবহ হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ সময় বিরোধী দল ও ভিন্নমতের অসংখ্য নাগরিক গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ। দীর্ঘ বছর ধরে প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।
বিবৃতিতে বলা হয়, গুম শুধু একজন ব্যক্তিকে তাঁর পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে না, বরং একটি পরিবারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও সামাজিক দুর্ভোগ তৈরি করে। নিখোঁজ ব্যক্তির ভাগ্যে কী ঘটেছে, তিনি জীবিত না মৃত, কোথায় আছেন কিংবা আদৌ কখনো ফিরে আসবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা পরিবারের সদস্যদের বছরের পর বছর বহন করতে হয়।
আয়নাঘর’ নিয়ে অভিযোগ
বক্তব্যে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন আটককেন্দ্রগুলোর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। সেখানে অসংখ্য মানুষকে আটকে রেখে অমানবিক ও নির্যাতনমূলক আচরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গোপন আটক ও নির্যাতনের এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে বেআইনিভাবে আটক বা গুমের শিকার হয়ে থাকলে তার প্রকৃত তথ্য পরিবারের কাছে প্রকাশ করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ ধরনের ঘটনার বিচার না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকে যায় বলেও উল্লেখ করা হয়।
আন্দোলনের পরও অপেক্ষায় বহু পরিবার
বিবৃতিতে বলা হয়, গুম হওয়া স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি, পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং বছরের পর বছর ধরে চলা অপেক্ষার বেদনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এসব বেদনা ও ক্ষোভের মধ্য দিয়েই ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও গুমের শিকার বহু ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে যেসব পরিবার এখনো তাঁদের নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মিরাজ শেখের অভিযোগ তদন্তের দাবি
বিবৃতিতে মোংলায় কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে মিরাজ শেখকে গুমের অভিযোগের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এ অভিযোগকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে এর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের দাবি জানানো হয়।
অভিযোগটি সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগটি সত্য না হলে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে না রেখে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে প্রশ্ন
বক্তব্যে বর্তমান বিএনপি সরকারের সংসদে উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে আইনি কাঠামোর কোনো দুর্বলতার কারণে দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য যে আইন প্রণয়ন করা হবে, সেখানে অপরাধের তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং দায়ীদের বিচারের বিষয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর বিধান রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
স্বাধীন তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার হওয়া সব ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং তাঁদের পরিবারের কাছে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা।
এ ছাড়া প্রতিটি গুমের ঘটনা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের ব্যবস্থা করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে শুধু আইন থাকলেই হবে না, সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবার যেন ভয় বা চাপ ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারে এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পায়, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের পুনরাবৃত্তি নয়
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আর কখনো যেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের সংস্কৃতি ফিরে না আসে।
বক্তব্যে বলা হয়, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেটি কোনোভাবেই আড়াল করা যাবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
গুমের শিকার প্রতিটি মানুষের পরিবারের কান্না ও দীর্ঘ অপেক্ষার জবাব দিতে হবে সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির মাধ্যমে। মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অতীতের সব গুমের ঘটনা সামনে এনে প্রকৃত সত্য জাতির কাছে তুলে ধরারও দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয়, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে কোনো নাগরিককে রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা কর্মকাণ্ডের কারণে বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করা হবে না এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।