চাঁদের মাথায় উজ্জ্বল তারা, সন্ধ্যার আকাশে মুগ্ধ বাংলাদেশ
আইয়ুব আলী । রংপুর
সন্ধ্যার আকাশে সরু বাঁকা চাঁদের পাশে উজ্জ্বল একটি আলোকবিন্দু। দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, চাঁদের মাথায় যেন একটি তারা লেগে আছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা গেছে। আকাশের এই সৌন্দর্য দেখে অনেকেই ছবি তুলেছেন, আবার কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যটি শেয়ার করেছেন।
চাঁদের পাশে দেখা যাওয়া উজ্জ্বল বস্তুটি সাধারণ কোনো তারা নয়, এটি শুক্র গ্রহ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় চাঁদ ও শুক্র গ্রহের আকাশে কাছাকাছি অবস্থানকে বলা হয় চাঁদ-শুক্র সংযোগ বা কনজাংশন। পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দুটি মহাজাগতিক বস্তু পাশাপাশি অবস্থান করছে বলে মনে হয়। তবে বাস্তবে চাঁদ ও শুক্র গ্রহের মধ্যে বিপুল দূরত্ব রয়েছে।
কেন এত উজ্জ্বল দেখা যায় শুক্র গ্রহকে?
শুক্র গ্রহ সৌরজগতের দ্বিতীয় গ্রহ। এটি সূর্যের চারপাশে ঘোরে এবং নিজে কোনো আলো তৈরি করে না। সূর্যের আলো শুক্র গ্রহের ঘন মেঘমণ্ডল থেকে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে পৌঁছায়। এ কারণেই গ্রহটিকে রাতের আকাশে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখা যায়।
শুক্র গ্রহকে অনেক সময় সন্ধ্যাতারা বা ভোরের তারা বলা হয়। তবে নামের মধ্যে তারা থাকলেও এটি কোনো নক্ষত্র নয়। নক্ষত্রের মতো নিজস্ব আলো না থাকলেও পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান এবং সূর্যের আলো প্রতিফলনের কারণে শুক্র গ্রহ রাতের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল মহাজাগতিক বস্তুগুলোর একটি। চাঁদের পাশে দেখা গেলে এর উজ্জ্বলতা আরও সহজে মানুষের নজরে আসে।
চাঁদ ও শুক্র গ্রহের এই সংযোগ কীভাবে ঘটে?
চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, আর শুক্র গ্রহ সূর্যের চারপাশে নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরছে। দুই মহাজাগতিক বস্তুর গতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবী থেকে তাদের আকাশে কাছাকাছি দেখা যায়। এই ঘটনাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে সংযোগ বা কনজাংশন বলা হয়।
এটি কোনো বিরল বা অলৌকিক ঘটনা নয়। সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ ও চাঁদের গতিপথের কারণে এমন দৃশ্য নিয়মিত দেখা যায়। কখনো চাঁদের পাশে শুক্র গ্রহ, কখনো বৃহস্পতি বা অন্য কোনো উজ্জ্বল গ্রহ দেখা যেতে পারে। তবে শুক্র গ্রহের উজ্জ্বলতা বেশি হওয়ায় চাঁদের পাশে এর উপস্থিতি সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।
খালি চোখেই দেখা যায় মহাজাগতিক সৌন্দর্য
চাঁদের পাশে শুক্র গ্রহ দেখতে কোনো বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশের দিকে তাকালেই উজ্জ্বল আলোকবিন্দুটি দেখা যেতে পারে। তবে ভবন, গাছপালা বা কুয়াশার কারণে কোনো কোনো স্থান থেকে দৃশ্যটি স্পষ্ট নাও হতে পারে।
দূরবীন ব্যবহার করলে শুক্র গ্রহের বিভিন্ন পর্যায় পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। পৃথিবী থেকে শুক্র গ্রহের আলোকিত অংশের আকার পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। এর কারণ হলো শুক্র গ্রহ সূর্যের চারপাশে ঘোরার সময় পৃথিবীর সঙ্গে তার অবস্থান পরিবর্তিত হয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে এমন দৃশ্য
আকাশে চাঁদের পাশে উজ্জ্বল গ্রহের উপস্থিতি মানুষের মধ্যে মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ বাড়াতে পারে। শিশু-কিশোরদের জন্য এটি সৌরজগতের গ্রহ, চাঁদের গতি এবং পৃথিবীর অবস্থান সম্পর্কে জানার একটি সুন্দর সুযোগ।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে পরিষ্কার জায়গা বেছে নিতে বলেন। আলোদূষণ কম এমন স্থানে চাঁদ ও উজ্জ্বল গ্রহের দৃশ্য আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। শহরের অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক আলো অনেক সময় আকাশের ম্লান বস্তুগুলো দেখতে অসুবিধা তৈরি করে।
১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার আকাশে চাঁদের পাশে দেখা যাওয়া উজ্জ্বল শুক্র গ্রহ তাই শুধু একটি সুন্দর দৃশ্য নয়, বরং মহাকাশের নিয়মিত গতিশীলতারও একটি উদাহরণ। আকাশের দিকে তাকিয়ে এমন দৃশ্য উপভোগ করার মাধ্যমে মানুষ মহাবিশ্বের বিশালতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।