হারাগাছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে শ্রমজীবী মানুষ, এর মধ্যে পৌরসভার কর বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ
আইয়ুব আলী । রংপুর
রংপুরের হারাগাছ পৌরসভায় নতুন করে হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌরকর নির্ধারণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর হঠাৎ করে বাড়তি করের বোঝা চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হারাগাছ পৌর এলাকার অধিকাংশ মানুষ শ্রমজীবী ও দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দিনমজুরি, ছোট ব্যবসা, শ্রমিকের কাজসহ বিভিন্ন পেশার আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলে এসব পরিবারের সংসার। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষের আর্থিক চাপও বেড়েছে।
এ অবস্থায় পৌরসভার বার্ষিক কর বা হোল্ডিং ট্যাক্স উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পৌরসভার উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে নিয়মিত কর প্রদান করা নাগরিকদের দায়িত্ব। তবে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানুষের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, আগের করের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সীমিত হারে বৃদ্ধি করা হলে জনগণের মধ্যে তেমন আপত্তি থাকার কথা নয়।
এ বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সাবেক কর নির্ধারণ শাখার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি জানান, পূর্বের ট্যাক্স অপরিবর্তিত রেখে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলে জনগণের কর দিতে দ্বিধা থাকার কথা নয়। তার মতে, কোনো পরিবারের পূর্বের কর ১০০ টাকা হলে সেটি ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হলে সাধারণ মানুষ তা মেনে নিতে পারেন। কিন্তু অ্যাসেসমেন্টের নামে পূর্বের ১০০ টাকার কর যদি এক হাজার টাকা করা হয়, তাহলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে।
তিনি দাবি করেন, জাইকার অর্থায়নে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণে পৌরসভার কর নির্ধারণ ও আদায় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেখানে বাসাবাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স তুলনামূলক কম ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার মাধ্যমে জনগণকে দ্রুত কর পরিশোধে উৎসাহিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, করের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখলে জনগণ নিয়মিত কর পরিশোধে আগ্রহী হবে এবং এতে পৌরসভার কর আদায়ের হারও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সক্ষম পরিবারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর বৃদ্ধির সুযোগ এবং সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিন্ন হারে কর নির্ধারণের বিষয়েও প্রশিক্ষণে আলোচনা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে কর আদায় বাড়ানো গেলে পৌরসভার রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে নাগরিক সেবা উন্নত করার পাশাপাশি পৌরসভার শ্রেণি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এজন্য সাধারণ জনগণের ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে ধাপে ধাপে কর আদায়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে, পৌরসভার বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে জনগণের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, পৌরসভায় নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকার সময়ে কর পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের মতামত কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে রাজস্ব প্রয়োজন হলেও সেই ব্যয়ের চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর দেওয়া উচিত নয়। বরং করদাতাদের সক্ষমতা বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও সহনীয় কর কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, কর বৃদ্ধির আগে প্রতিটি হোল্ডিংয়ের মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছে, আগের করের তুলনায় নতুন কর কত শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং কোন ভিত্তিতে নতুন কর নির্ধারণ করা হয়েছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কর বৃদ্ধির কারণে পৌরসভার মোট রাজস্ব কতটা বাড়বে এবং সেই বাড়তি অর্থ দিয়ে জনগণ কী ধরনের নাগরিক সুবিধা পাবেন, সেটিও প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় এক সাবেক জনপ্রতিনিধি বলেন, পৌরসভার উন্নয়ন ও শ্রেণি উন্নতি করতে হলে জনগণের সক্ষমতা বিবেচনা করে কর নির্ধারণ করা উচিত। পূর্বের ট্যাক্স বহাল রেখে খুব বেশি বাড়াতে চাইলে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। এতে জনগণও স্বাচ্ছন্দ্যে কর দিতে পারবেন এবং পৌরসভার রাজস্ব আদায়ও বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, অতীতেও অনেক পরিবারের কর ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং স্থানীয় অনেক মানুষ এর সাক্ষী রয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি নির্বাচিত হলে পূর্বের কর কাঠামোতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার কথাও জানান।
তবে কর বৃদ্ধির বিষয়ে হারাগাছ পৌর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে নতুন কর নির্ধারণের কারণ, অ্যাসেসমেন্টের পদ্ধতি এবং কর বৃদ্ধির প্রকৃত হার সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পৌরসভার উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমজীবী, নিম্নআয় ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে আকস্মিক ও বড় ধরনের কর বৃদ্ধির পরিবর্তে জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে সহনীয় হারে কর নির্ধারণ করা হবে।