২৩৫ ইউনিট বিদ্যুতের বিল ৫০৬ কোটি টাকা, বরখাস্ত পল্লী বিদ্যুতের জিএম
মাগুর প্রতিনিধি মনোয়ার হোসেন
মাগুরায় মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও এক গ্রাহকের নামে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকার বিল দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অস্বাভাবিক এ বিলের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিলটি সংশোধন করা হয়েছে। একই ঘটনায় মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপককে (জিএম) বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী।
ঘটনাটি ঘটেছে মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামে। ওই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহীদুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. আলেয়া খাতুনের নামে সেপ্টেম্বর মাসের বিদ্যুৎ বিলটি ইস্যু করে মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া জোনাল অফিস।
বিলের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ আগস্ট গ্রাহকের মিটারের পূর্ববর্তী রিডিং ছিল ১৬০ ইউনিট। পরবর্তী ৮ সেপ্টেম্বর মিটারের বর্তমান রিডিং দাঁড়ায় ৩৯৫ ইউনিটে। অর্থাৎ এক মাসে ওই গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে মাত্র ২৩৫ ইউনিট।
স্বাভাবিক হিসাবে ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য গ্রাহকের বিল হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১ হাজার ৯৬৩ টাকা। কিন্তু গ্রাহকের হাতে দেওয়া বিলে পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখানো হয় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা।
বিলের হিসাবে দেখা যায়, ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে ডিমান্ড চার্জ হিসেবে দেখানো হয়েছে ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা। এর সঙ্গে ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকা ভ্যাট এবং ১০ টাকা মিটার ভাড়া যোগ করা হয়। সব মিলিয়ে বিলের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা।
এমন অস্বাভাবিক বিল হাতে পেয়ে হতবাক হয়ে পড়েন গ্রাহক ও তার পরিবারের সদস্যরা। পরে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা বিলটি যাচাই করেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রাহকের মিটার পরিবর্তনের সময় নতুন মিটারের সিল নম্বরের কিছু ডিজিট ভুল করে ডিমান্ড চার্জের ঘরে পোস্টিং হয়ে যায়। ফলে বিল তৈরির সময় ওই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অস্বাভাবিক বড় অঙ্কের অর্থ যুক্ত হয়ে যায়।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে বিষয়টিকে তথ্য ইনপুট বা টাইপিংয়ের ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ভুলটি শনাক্ত হওয়ার পর বিলটি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিল অনুযায়ী গ্রাহকের প্রকৃত পরিশোধযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করা হয় এবং তিনি সেই বিল পরিশোধ করেন।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগে মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম, বিলিং সুপারভাইজারসহ চার কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
ঘটনাটি নিয়ে আরও ব্যবস্থা হিসেবে ৩০ সেপ্টেম্বর মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. মহিতুল ইসলামকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ভুক্তভোগী গ্রাহক আলেয়া খাতুনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
এদিকে, মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে শত শত কোটি টাকার বিল তৈরি হওয়ায় বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুত ও যাচাই ব্যবস্থার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মিটার পরিবর্তনের পর তথ্য সংযোজনের সময় কীভাবে এত বড় অঙ্কের ভুল তথ্য বিলিং ব্যবস্থায় যুক্ত হলো, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ৫০৬ কোটি টাকার বিলটি প্রকৃত পাওনা নয়। মিটার পরিবর্তনের পর তথ্য ইনপুটের ভুলের কারণেই এই অস্বাভাবিক বিল তৈরি হয়েছিল। পরে বিষয়টি শনাক্ত করে বিল সংশোধন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। একজন সাধারণ আবাসিক গ্রাহকের মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে ৫০৬ কোটি টাকার বিল তৈরির ঘটনা বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই ও তদারকির প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।