আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডাকে অভিযোগ হিসেবে গ্রহণে দুদকের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ: নাহিদ ইসলাম
আইয়ুব আলী। রংপুর
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা সেল থেকে প্রচারিত গুজবকে দুর্নীতির অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলটির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে ভিত্তি করে দুদকের কার্যক্রম পরিচালিত হলে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি দুদকের আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে জুলাই সনদের আলোকে একটি স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানান।
গুজবকে অভিযোগ হিসেবে গ্রহণের অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের দোসরদের প্রায় সাত মাস আগে ছড়ানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণাকে সরাসরি অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতাদের সামাজিকভাবে হেয় ও চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে দুদককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার ভাষ্য, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের হয়রানি করার ক্ষেত্রে দুদককে ব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুদককে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে বিতর্ক
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বদলি এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। ১৩ সেপ্টেম্বর সংস্থাটি জানায়, তার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিদেশে অর্থপাচার, সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।
অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেছেন, তার বিরুদ্ধে দুদকের নতুন অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুর সঙ্গে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ‘দৈনিক আজকের কণ্ঠ’ নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রায় সাত মাস আগে প্রকাশিত প্রচারণার মিল রয়েছে। তিনি ওই অভিযোগকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
দুদকের বক্তব্য
আসিফ মাহমুদের অভিযোগের বিষয়ে দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মনগড়া নয়। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। প্রয়োজনে অর্থপাচারের অভিযোগে উল্লেখিত দেশগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হবে বলেও জানান দুদক সচিব।
দুদক সচিব আরও বলেন, অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান বা তদন্তে যা পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
জুলাই সনদের আলোকে দুদক পুনর্গঠনের দাবি
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো দুদকেরও আমূল সংস্কারের দাবি উঠেছিল। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে জুলাই সনদের নির্ধারিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে এবং সংবিধান লঙ্ঘন করে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের নিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়ে এখন প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদের আলোকে দুদক পুনর্গঠন না করে দলীয়করণের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে হয়রানি ও দমন করার পুরোনো পথেই প্রতিষ্ঠানটিকে ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস
এনসিপির পক্ষ থেকে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদের আলোকে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক দুদক পুনর্গঠন করা হলে যেকোনো অভিযোগের মুখোমুখি হতে এবং সুষ্ঠু তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। তবে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গঠিত এবং দলীয়করণের শিকার কোনো কমিশনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলে তিনি জানান।
বক্তব্যের শেষে নাহিদ ইসলাম ষড়যন্ত্রমূলক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। একইসঙ্গে জুলাই সনদের চেতনা ও ঘোষিত সংস্কার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একটি স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।