দলীয় বিবেচনায় ১১ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ: গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানাল জামায়াত
আইয়ুব আলী। রংপুর
বাংলাদেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ নিয়োগকে “দলীয় বিবেচনাপ্রসূত” দাবি করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে সরকারের এ সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং নিয়োগগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত ১৪ মে একদিনে দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর ১৫ মে দেওয়া এক বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের জনগণ মনে করছে এসব নিয়োগে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য এবং দলীয় বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে দলীয়করণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা জাতির জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র। সেখানে যদি প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে পূরণ করা হয়, তাহলে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক সমাজের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জামায়াতের এই নেতা অতীতের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের কারণে অতীতে অস্থিরতা, সহিংসতা এবং দীর্ঘ সেশনজটের মতো সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। জনগণ আবারও সেই পরিস্থিতি দেখতে চায় না। তার মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা না গেলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক প্রশাসনিক নিয়োগের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গত ১৫ মার্চ দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের ঘটনায়ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তখন দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অপচেষ্টা।
তার অভিযোগ, সরকার সেই ধারা থেকে সরে আসেনি; বরং এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা দেশের গণতন্ত্র, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অশনিসংকেত।
বিবৃতিতে “জুলাই বিপ্লব”-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণ একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আশা করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের কর্মকাণ্ডে ভিন্ন চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা। অথচ সরকার সেই পথ অনুসরণ না করে পক্ষপাতদুষ্ট ও অগণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, এটি জাতির প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সুস্থ একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা ও মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার অবিলম্বে এসব নিয়োগ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান। তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে বলেন, আল্লাহ যেন বাংলাদেশকে সত্য, ন্যায় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পথে পরিচালিত করেন।