আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ উন্মাদনা, সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা
আইয়ুব আলী। রংপুর
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষ যখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তখন দেশের একটি অংশে ফুটবল উন্মাদনা ঘিরে আয়োজন ও উদযাপন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার বিশ্বকাপ ম্যাচকে কেন্দ্র করে কিছু সমর্থকের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অনেক স্থানে ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অসংখ্য পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগের চিত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও পানিতে ভেসে যাওয়া লাশ উদ্ধারের ঘটনাও মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। বৃষ্টির মধ্যেও বহু সমর্থক প্রিয় দলের খেলা উপভোগ করতে জড়ো হন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, কিছু সমর্থক আর্জেন্টিনার জয়ের প্রত্যাশায় বিশেষ দোয়া করছেন। এমনকি কয়েকটি ভিডিওতে সেজদারত অবস্থায় দলটির জয়ের জন্য প্রার্থনা করার দৃশ্যও দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এসব দৃশ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যখন দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী বন্যার পানিতে জীবন-জীবিকার সংকটে ভুগছে, তখন বিনোদনকে কেন্দ্র করে এমন উন্মাদনা কতটা যৌক্তিক। সমালোচকদের মতে, জাতীয় দুর্যোগের সময় মানুষের উচিত ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবিক সহায়তার কাজে অংশ নেওয়া।
একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “দেশের একদিকে মানুষ খাবার ও আশ্রয়ের জন্য সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে আমরা বিদেশি দলের জয়ের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করছি। এটি আমাদের সামাজিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন তুলে দেয়।” একই ধরনের মতামত প্রকাশ করেছেন আরও অনেকে।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেকের মতে, খেলাধুলা মানুষের বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং দুর্যোগের সময়েও মানুষ স্বাভাবিক জীবনের কিছু অংশ ধরে রাখতে চায়। তাদের যুক্তি, ফুটবল দেখা বা প্রিয় দলকে সমর্থন করা কোনো অপরাধ নয়। একইসঙ্গে তারা মনে করেন, মানবিক দায়িত্ব পালন এবং খেলাধুলা উপভোগ করা একে অপরের বিপরীত বিষয় নয়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের বিতর্ক মূলত সমাজের মূল্যবোধ, অগ্রাধিকার এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করে। তারা বলছেন, জাতীয় সংকটের সময়ে নাগরিকদের মানবিক দায়িত্ববোধ আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে খেলাধুলা ও বিনোদনের ক্ষেত্রেও সংযম ও বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যেকোনো ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং জনমতকে প্রভাবিত করে। ফলে একটি ছোট গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড কখনও কখনও পুরো সমাজের চিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়। তাই কোনো ঘটনার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই এবং সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
এদিকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠন বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনেক তরুণ-তরুণী এবং সামাজিক কর্মী মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ফুটবলপ্রেমীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য।