স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএই রাষ্ট্রদূতের বৈঠক: দক্ষ জনবল রপ্তানি, বিনিয়োগ ও মানবপাচার প্রতিরোধে জোর
আইয়ুব আলী, রংপুর
বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারণ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ড্রাইভার, মালী ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ, সাইবার সিকিউরিটি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মানবপাচার প্রতিরোধে যৌথ উদ্যোগ জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে।
শনিবার (২৩ মে) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ আলী খাসিফ আল-হামুদী। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, মানবপাচার প্রতিরোধ, দক্ষ জনবল রপ্তানি, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (Mutual Legal Assistance Treaty) নিয়ে আলোচনা করা হয়।
রাষ্ট্রদূত আল-হামুদী বলেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুপ্রতিম দেশ। বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত রয়েছেন এবং তারা দুই দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তিনি জানান, বর্তমানে আমিরাতে দক্ষ ড্রাইভার ও মালীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষিত কর্মী নিতে তাদের দেশ বিশেষভাবে আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী ড্রাইভার নিয়োগের ক্ষেত্রে ছয় মাসের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। তাই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী সরবরাহ করতে পারলে বাংলাদেশের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ সরকার প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল প্রেরণের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে। তিনি প্রস্তাব দেন, দুই দেশ যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে ছয় মাস মেয়াদি আন্তর্জাতিক মানের ড্রাইভার প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে পারে। প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্নকারীদের পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে দক্ষ চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোর জন্য একটি অভিন্ন ড্রাইভার প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর বিষয়েও বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে বলেও তিনি রাষ্ট্রদূতকে আশ্বস্ত করেন।
বৈঠকে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিখাতেও দুই দেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। রাষ্ট্রদূত আল-হামুদী জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বাংলাদেশে সাইবার সিকিউরিটি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য উদীয়মান খাতে বড় পরিসরে বিনিয়োগে আগ্রহী। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে আমিরাত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিরাতের বিনিয়োগ আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করেছে এবং এ ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হবে।
মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ নিয়েও বৈঠকে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়। রাষ্ট্রদূত জানান, মানবপাচার মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র মানবপাচার নয়, বরং সব ধরনের ফৌজদারি অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ স্বাক্ষর করা যেতে পারে। এতে দুই দেশের আইনি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানান। এ সময় রাষ্ট্রদূত আল-হামুদী মন্ত্রীকে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান।
সাক্ষাৎকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং উপসচিব বেগম মিনারা নাজমীনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।