September 28, 2026, 8:15 am
শিরোনাম:
নিয়ন্ত্রণহীন এআই কি ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে? বিল গেটসের সতর্কবার্তায় নতুন করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ পার্বতীপুরে যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর, বি এন পির চাঁদাবাজির অভিযোগ ফুলবাড়ীতে মুত্তাকী কল্যাণ সংস্থা কর্তৃক ক্যান্সার আক্রান্তকে আর্থিক সহায়তা প্রদান জমি-জমা সংক্রান্ত জেরে পার্বতীপুরে সংঘর্ষে শিক্ষক ও গৃহবধু আহত পার্বতীপুরে রেলওয়ে শ্রমিক-কর্মচারী দলের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে যা বললেন স্বেচ্ছাসেবক দলের তুষার সেভ রংপুর’ প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন: পরিচয় গোপন রেখে অপরাধের তথ্য দিতে পারবেন নাগরিকরা ঘোড়াঘাট সরকারি কলেজে নবীন বরণ অনুষ্ঠিত পার্বতীপুরে ৫ কেজি গাঁজাসহ মাদক ব্যাবসায়ী গ্রেফতার

নিয়ন্ত্রণহীন এআই কি ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে? বিল গেটসের সতর্কবার্তায় নতুন করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

আইয়ুব আলী
বিল গেটস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, AI, এআইয়ের ঝুঁকি, এআই অপব্যবহার, ১০০ কোটি মৃত্যু, প্রযুক্তি, AI নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক খবর

নিয়ন্ত্রণহীন এআই কি ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে? বিল গেটসের সতর্কবার্তায় নতুন করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ মানবসভ্যতার জন্য যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। এই ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। সম্প্রতি এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এআই এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠছে যে, অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, যার ফলে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

তবে গেটসের বক্তব্যকে সরাসরি ‘এআই ১০০ কোটি মানুষকে হত্যা করবে’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য ছিল সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে। বিশেষ করে মানুষের খারাপ উদ্দেশ্য এবং অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির ক্ষমতা একসঙ্গে ব্যবহৃত হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের অসৎ উদ্দেশ্যের সঙ্গে সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তির সমন্বয় এমন একটি শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হতে পারে, যার নজির আগে দেখা যায়নি।

কেন এআই নিয়ে এত বড় আশঙ্কা?

এআই এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা ছবি তৈরি করার প্রযুক্তি নয়। আধুনিক এআই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কোড লিখতে পারে, বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে এবং মানুষের জটিল কাজের কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। বিল গেটসের মতে, প্রযুক্তিটির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে এবং আগের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের তুলনায় এআইয়ের বিস্তারের গতি অনেক বেশি।

আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত নিজের একটি দীর্ঘ লেখায় গেটস এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেখানে তিনি বলেন, এআইয়ের কারণে মানুষের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, সামাজিক সম্পর্ক এবং সাইবার নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে তিনি সতর্ক করেন, এআই যদি এমন ব্যক্তিদের হাতে যায় যারা মানুষের ক্ষতি করতে চায়, তাহলে তাদের সক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারে।

সাইবার হামলা থেকে জীবাণু অস্ত্র, কোথায় ঝুঁকি?

বিল গেটসের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো এআইয়ের মাধ্যমে অপরাধীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। তাঁর মতে, বর্তমানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালাতে যে জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়, উন্নত এআই ভবিষ্যতে সেই বাধা অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে।

হাসপাতাল, ব্যাংক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, সরকারি সেবা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাইবার হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। একটি উন্নত এআই যেমন কোনো সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করে সেটি ঠিক করতে সহায়তা করতে পারে, তেমনি একই প্রযুক্তি কোনো অপরাধীকে সেই দুর্বলতা কাজে লাগাতেও সহায়তা করতে পারে।

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো জীবপ্রযুক্তি। গেটসের মতে, এআই ওষুধ এবং টিকা তৈরির গবেষণাকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত এআইয়ের অপব্যবহার হলে ক্ষতিকর জীবাণু বা জৈবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ একই প্রযুক্তির মধ্যে মানবকল্যাণ এবং মানবনিরাপত্তার জন্য বিপরীতমুখী দুই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এআই কি নিজেই মানুষের বিরুদ্ধে যাবে?

এআই নিয়ে আলোচনায় আরেকটি প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে অত্যন্ত উন্নত এআই সিস্টেম মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে কি না। বিল গেটস তাঁর আগস্টের লেখায় এই সম্ভাবনাকেও ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান এআই সিস্টেমগুলো মাঝে মাঝে তাদের নির্মাতাদের প্রত্যাশার বাইরে আচরণ করে। প্রযুক্তি আরও শক্তিশালী হলে মানুষের স্বার্থের সঙ্গে এআইয়ের আচরণের অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ভাবতে হবে।

তবে এটিকে বর্তমান বাস্তবতার কোনো নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে একটি ঝুঁকি-ভিত্তিক আলোচনা। ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটবে, এমন কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস গেটস তাঁর বক্তব্যে দেননি। বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার হলে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা কতটা বড় হতে পারে।

এআইয়ের ইতিবাচক দিকও দেখছেন গেটস

বিল গেটসের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি এআইকে শুধুই বিপজ্জনক প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন না। বরং তাঁর মতে, যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে এআই মানবজাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকার বয়ে আনতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে এআই রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা গবেষণা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। কৃষিতে আবহাওয়া, বীজ নির্বাচন, ফসলের রোগ এবং মাটির অবস্থা সম্পর্কে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

গেটস বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, নিম্নআয়ের দেশগুলোর কৃষকরা এআইয়ের মাধ্যমে উন্নত কৃষি পরামর্শ পেতে পারেন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ছে। সেখানে এআই কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

চাকরির বাজারেও বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা

এআইয়ের প্রভাব শুধু নিরাপত্তা বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কর্মসংস্থানের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন গেটস। তাঁর আগস্টের লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, এআই অনেক ধরনের অফিসভিত্তিক কাজ দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে। বিক্রয়, গ্রাহকসেবা, সফটওয়্যার, আইনি সহায়তা, ডেটা বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের কাজের ধরন বদলে যেতে পারে।

তাঁর মতে, অতীতের শিল্পবিপ্লব বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে বর্তমান এআই বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আগের প্রযুক্তিগুলো সাধারণত মানুষের শারীরিক শ্রমকে বেশি প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এআই সরাসরি মানুষের চিন্তাশক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক কাজের ওপর প্রভাব ফেলছে।

ফলে এআইয়ের যুগে শুধু নতুন প্রযুক্তি শেখানো নয়, কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নিয়ন্ত্রণের জন্য কী করা প্রয়োজন?

সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস এআইয়ের ওপর সরকারি নজরদারি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। আইনপ্রণেতা ও সরকারি সংস্থাগুলোকেও আলোচনায় যুক্ত হতে হবে।

আগস্টে প্রকাশিত তাঁর লেখাতেও তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কারণ এআইয়ের প্রভাব শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাইবার হামলা, তথ্যপ্রবাহ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র আন্তর্জাতিকভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

তিনি এআই ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্র, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কিংবা জলবায়ু ইস্যুতে যেমন আন্তর্জাতিক কাঠামো রয়েছে, এআইয়ের ক্ষেত্রেও দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা ও নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন হতে পারে।

শেষ কথা

বিল গেটসের ‘১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু’ সংক্রান্ত মন্তব্য মূলত একটি সম্ভাব্য বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে এআইয়ের দ্রুত বিকাশ এবং এই প্রযুক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে সম্ভাব্য ক্ষতির ব্যাপকতা।

এআই একই সঙ্গে চিকিৎসা, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আবার যথাযথ নিরাপত্তা, নীতিমালা ও নজরদারি না থাকলে সাইবার হামলা, প্রতারণা, ভুয়া তথ্য, কর্মসংস্থান সংকট এবং আরও গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। গেটসের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই মূলত একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: এআই কতটা শক্তিশালী হবে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, সেই শক্তি কার হাতে থাকবে এবং কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

বর্তমানে এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি দুটিকেই একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। গেটসের বক্তব্য সেই বিতর্কে নতুন করে বড় ধরনের নিরাপত্তা প্রশ্ন সামনে এনেছে।



ফেসবুকে আমরা